দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল আলোকিত করবে সরকারের পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প
2, November, 2026, 7:19:11:PM
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি, পরিবেশ ও জনজীবনে আমূল পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে সরকারের মেগা প্রকল্প ‘পদ্মা ব্যারাজ’। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট দূর, নদ-নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা হ্রাস এবং কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতা, বন্যা ও নদীভাঙন মোকাবিলায় তৈরি হবে নতুন সুযোগ। সরকারের আশা, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে কৃষি, মৎস্য, কর্মসংস্থান, নৌ-যোগাযোগ ও পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ৭ কোটি মানুষ সরাসরি উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে দেশের চার বিভাগের ১৯টি জেলার ১২০টি উপজেলার প্রায় ৭ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবেন। পাশাপাশি কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টন মাছের উৎপাদন বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ৭ হাজার ১২৭ কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যয় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা গত ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পদ্মা ব্যারাজের প্রথম পর্যায়ের প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। প্রকল্পের অর্থায়ন হবে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে। প্রকল্পের মূল অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায়। পদ্মা নদীর ওপর প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে থাকবে ৭৮টি পানিনিষ্কাশন কপাট, ১৮টি তলদেশ নির্গমন পথ, দুটি ফিশ পাস, নৌ-লক, গাইড বাঁধ ও অ্যাপ্রোচ বাঁধ। এ ছাড়া প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ এবং ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে দৃশ্যমান কাজের উদ্বোধনের আশা গত ২৫ অক্টোবর পাবনার সুজানগর উপজেলার সাতবাড়িয়া কাঞ্চনপার্ক এলাকায় প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের স্থান পরিদর্শন করেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। এ সময় তিনি জানান, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পটির দৃশ্যমান কাজের উদ্বোধন করবেন। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। সুন্দরবন রক্ষায়ও রাখবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বিশেষজ্ঞদের মতে, শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন নদ-নদীতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও সুপেয় পানির প্রাপ্যতা হুমকির মুখে পড়ছে। সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে বর্ষার পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহ করা সম্ভব হলে গড়াই-মধুমতী, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, চন্দনা-বারাশিয়াসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানিপ্রবাহ পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি জমা, নদীভাঙন ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সব মিলিয়ে পদ্মা ব্যারাজ শুধু একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়; এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি, পরিবেশ ও জনজীবন রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। যথাযথ পরিকল্পনা ও সফল বাস্তবায়ন হলে এ প্রকল্প খুলনা, বরিশালসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।